২৬/০৫/২০২০ ১৫:১০:০৭

matrivhumiralo.com পড়ুন ও বিজ্ঞাপন দিন

প্রতি মুহূর্তের খবর

o ফেরিঘাটে আটকেপড়া মানুষদের ফিরে আসার আহ্বান : বেনজীর আহমেদ o স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের নামাজ পড়তে হবে o করোনা মোকাবিলায় মেডিক্যাল টিমসহ ১০০ সেনাসদস্য o করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যক্রম শুরু করেছে সেনাবাহিনী o করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর মতবিনিময়
আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  বিনোদন  >  ‘প্রাণের উল্লাসে, চলো মিলি এক স্রোতে’ -নাজমুস সায়াদী

‘প্রাণের উল্লাসে, চলো মিলি এক স্রোতে’ -নাজমুস সায়াদী

পাবলিশড : ০৯/০৩/২০১৯ ১০:৪২:০১ এএম
‘প্রাণের উল্লাসে, চলো মিলি এক স্রোতে’ -নাজমুস সায়াদী

বিনোদন ডেস্ক ::

ভোর পাঁচটা দশ ঘড়িতে এলার্ম ছিল। এলার্ম বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে উঠে পড়লাম। খুব দ্রুত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থলে পৌঁছতেই হবে এমনই সিদ্ধান্ত আছে। পূর্ব প্রস্তুতি রাতেই নিয়েছিলাম। ফজরের নামাজ আদায় করতে হবে মগবাজার চৌরাস্তা মসজিদ অথবা মগবাজার রেলগেইট। অযু করে রেডি হয়ে সফরের সকল আয়োজনের প্রস্তুতি নিলাম। সফরের প্রস্তুতি ও সফররত অবস্থার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিলাম। সঙ্গে নিলাম হেডফোন, চশমা, হাত ঘড়ি ও ক্যামেরা মোবাইল। অন্য একটি মোবাইলও সঙ্গে ছিল। প্রয়োজনের তাগিদে পকেটে একটি মার্কেটিং ব্যাগও সাথে নিলাম। সিদ্ধান্ত ছিল পাঞ্জাবি পড়ব। কিন্তু শীতের কারণে রাতেই সিদ্ধান্তটি পাল্টিয়ে সার্ট-প্যান্ট পড়ে রওয়ানা হলাম। 
নয়াটোলা থেকে হেঁটে হেঁটেই মগবাজার চৌরাস্তা জামে মসজিদে পৌঁছলাম। সেখানেই ফজরের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে আমার পরিচিত কাউকে খুঁজে পেলাম না। চুপচাপ মসজিদে বসে রইলাম। নামাজ শেষে মোনাজাতও শেষ হয়ে গেলো। মানসিক জড়তার কারণে কাউকে ফোন দিব কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর দেখলাম দু’জন ব্যক্তি ফোন করছে আর কাউকে যেন বলছে কোথায় যাব? জিজ্ঞাসা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু সেই জড়তা এখনও আমার মধ্যে বাসা বেঁধে আছে। সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম। কোথায় যাবেন গাজীপুর? তাদের হ্যাঁ সম্মতিতে আমরা তিনজন মগবাজার রেলগেইট উপস্থিত হলাম। দেখতে পেলাম দুইটি বাস এবং আবু সাঈদ ভাই। তিনি বললেন, এতো দেরী কেনো? এবং বললেন আপনারা সামনের বাসটিতে উঠবেন। 
আমরা দ্রুত সেখানে পৌঁছে গাড়িতে উঠলাম। জানালার পাশের আসনটি বেছে নিলাম। আমার প্রিয় আসন। কিন্তু পায়ের নিচে সমস্যা দেখা দিলো দুইটি মাটির হাড়ি! মনে মনে চিন্তা করলাম, মাটির হাড়ি কেনো? আবার পাশে রাখা আরো দুইটি হাড়ি। ভেবে চিন্তে কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। বাসে ব্যানার টাঙানোর প্রস্তুতি চলছে। মন খুব চাচ্ছিলো ব্যানারটা দেখে আসি। কিন্তু আবার সেই জড়তাÑ নাম তার অলসতা। মনের এসব জড়তার কারণে আমার সূরা ত্বোয়া-হা ২৫-২৮ নং আয়াতের কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে বলা হয়েছে “রাব্বিশ রাহালি সদরি, ওয়াইয়া সিরলি আমরি, ওয়াহলুল ঊখদাতাম মিললিসান, ইয়াফ ক্বাহু ক্বাওলি।” অর্থাৎ “হে আমার পালনকর্তা আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।”
যথাসময়ে আমরা সবাই প্রস্তুতি শেষ করে আসনে অবস্থান করলাম। এবং সকাল ৭টায় “ক্রিয়েটিভ ট্যুরিস্ট ক্লাব”-এর পক্ষ থেকে আমাদের আয়োজনের বাস মহান আল্লাহর নামে যাত্রা শুরু করলো। হাতিরঝিলের সামনে থেকে দুটি বাস রওনা হলো ন্যাশনাল পার্ক, গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ন্যাশনাল পার্কের আরেক নাম ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’ গাজীপুর। বাস চললো ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী রোড দিয়ে। সাত রাস্তা, নাবিস্কো, উত্তরা ও বিমানবন্দর, টঙ্গি ও গাজীপুর দিয়ে। বাসের মধ্যেই আমাদের সবার হাতে একটি করে প্রোগ্রাম সিডিউল দেয়া হলো এবং আইডি কার্ডও দেয়া হলো। এই প্রোগ্রামে দুই প্রকার আইডি কার্ড করা হয়েছে। একটিতে নিচের দিকে লেখা ছিল ‘ডেলিগেট’ আর অন্যটিতে লেখা ছিল ‘ইসি সদস্য’। বাসের মধ্যেই একটি সেলফি তুললাম। সবাইকে আমার পরিচিত মনে হলো। ইসি সদস্যগণ বাসের মধ্যেই আমাদের সমস্যা উদ্ঘাটন করে সমাধান করার চেষ্টা করছেন। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা আমাদের স্পটে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু ভিতরে প্রবেশের পরে ট্যুরিস্ট থাকার পরও রাস্তা ভুল হওয়ায় আমাদেরকে আবার পেছনের দিকে ফিরে আসতে হলো। এবং স্পট ‘চামেলি’তে আবার ঘুরে আসতে হলো। বাস থেকে আমরা সবাই নেমে পড়লাম এবং আমি একটি ব্যানারের ছবি মোবাইল বন্দি করলাম। কিন্তু মজার বিষয় হলো আমি দেখলাম আমাদের বাসে যারা ছিল সবাই পরিচিত কিন্তু দ্বিতীয় বাসটিতে বেশিরভাগ সদস্যকেই আমরা চিনতে পারলাম না। আমরা বাস থেকে নেমেই প্রচুর ঠা-া অনুভব করলাম। কিন্তু রাস্তাতে ঠিক ততোটা ঠা-া ছিলো না। ঠা-া হওয়ার একটাই কারণ তা হলো ভিতরে প্রচুর গাছ ছিল। সূর্যের দেখা খুব কম মিলে। আমরা কিছুক্ষণ দুই হাত জড়োসড়ো করে থাকলাম। তারপর আমরা সবাই একে অপরের সাথে কুলাকুলি এবং সালাম বিনিময় করলাম। 
সেখানে আমরা প্রায় ১শ’ জনের উপরে উপস্থিত হলাম। সফরের শুরুতে আমাদের মধ্যেই অনেকেই জানতাম না যে, আমাদের শিক্ষা সফর ও মিলনমেলার আয়োজনটা কোথায় করা হবে? আর এজন্যে আমাদের কৌতুহলটা ছিল অনেক বেশি এবং সফরে যাওয়ার আনন্দটাও ছিল অনেক বেশি। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কোথাও কোনো বড় ধরনের প্রোগ্রাম করতে পারি না। তাছাড়া ঢাকা শহরের বদ্ধ জীবনের বাইরে একটু আনন্দ করতে পারাটাও অনেক মজার। 
ইতোমধ্যেই স্পটে একজন ট্যুরিস্ট একটি ঘোড়া উপস্থিত করলেন। আমরা সবাই সেখানে গেলাম। জানতে পারলাম, কিছুদূর পর্যন্ত ঘোড়ার চড়ে ঘুরলে ৫০ টাকা করে নেয়া হবে। কিন্তু আমরা কেউ সেই ঘোড়াতে ঘুরতে সাহস পেলাম না। কারণ ছিলো যদি এখানে আমরা আবার ফিরে আসতে না পারি। কিন্তু অনেকেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাদের চেহারা ক্যামেরা বন্দি করলো।
সিডিউল মোতাবেক সবাইকে ফ্রেশ ও আসন গ্রহণ করার কথা বলা হলো। এদিকে ভ্যানে করে হাড়ি-পাতিল ও রান্নার জন্য প্রস্তুতির আয়োজন চলছে। আমার জানা ছিলো না এখানেই রান্না হবে। সকল প্রকার প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে আমরা এখানে অনেক দিক থাকবো। চেয়ারের মাধ্যমে আসন তৈরি করা হলো। সামনে ব্যানার টাঙানো হলো। আমি ব্যানারটির একটি ছবি মোবাইলে সেভ করলাম। ব্যানারটি লেখা ছিল এরূপ- 
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
‘প্রাণের উল্লাসে, চলো মিলি এক স্রোতে’
শিক্ষা সফর ও মিলন মেলা-২০১৮
ক্রিয়েটিভ ট্যুরিস্ট ক্লাব, রমনা, ঢাকা।
ইউনিট সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাশেদ ভাই খুব দ্রুত কাঠের কয়েকটি টুকরো দিয়ে টেবিলও তৈরি করলেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো যথাসময়ে। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শুরুতেই কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। দুই ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছিল। একটি অগ্রসর কর্মীদের জন্য আর অন্যটি সদস্যদের জন্য। কিন্তু দুটি প্রশ্নপত্রের মধ্যেই কিছু প্রশ্নের মিল ছিল। কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনও ছিল খুব মজার। সেখানে কর্মীদের মাঝে কলমও বিতরণ করা হলো। সময় ছিল ১৫ মিনিট। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই লেখা শেষ করা হলো। কিন্তু কুইজের নম্বর দেওয়ার সিস্টেমটা ছিল অসাধারণ। অর্থাৎ যার নামে যে প্রশ্নপত্রটি ছিল সে তার উত্তরপত্র নিজের কাছে রাখতে পারবে না। একজন আরেকজন বদল করা বাধ্যতামূলক ছিল। সকল প্রশ্নের উত্তর মঞ্চ থেকে বলা হলো। আর আমরা অন্যদের উত্তরপত্রে সেটিকে মার্কিং করছি এবং নম্বরও দিচ্ছিলাম। 
প্রশ্নগুলির মধ্যে কিছু প্রশ্ন ছিল এরকম- ১. সূরা জারিয়া অর্থ কি? ২. মৃত্যুর পর মানুষকে কোন আমলটি সম্পর্কে প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? ৩. ‘যারা আল্লাহ ও শেষ বিচার দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল (সা.)-এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’- আল্লাহর এ কথাগুলো কোন সূরার কত নম্বর আয়াত? ৪. ক্রয়-বিক্রয়কে আরবীতে কি বলে? ৫. তরজমায়ে কুরআন কে লিখেছেন? ৬. ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী বই-এর আলোকে ব্যক্তিগত গুণাবলী কি কি? ৭. চরিত্র গঠনের মৌকি উপাদান বই-এর আলোকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দিকগুলো কি কি? ৮. কোন সূরাতে মীম হফরটি নেই? ৯. আল কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ সম্পূর্ণ সূরা কোনটি? ১০. আদর্শবাদী দলের পতনের বই-এ ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিনষ্টের কারণগুলো লিখুন : ১১. রুকনিয়াতের আসল চেতনা বইয়ের লেখক কে? ১২. বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অনুপাত কত? এরকম আরো কিছু প্রশ্ন ছিল। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, সর্বশেষ প্রশ্নটির উত্তর লেখাই ছিল। 
কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন শেষ করা হলো। এরপর শুরু হলো ‘হালকা নাস্তা’র পালা। এর নাম হালকা নাস্তা। প্লেট ভরা খিচুরি। ইতোপূর্বে এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার কারণে এরকম নাস্তা খুব খেয়েছি। অন্য জায়গা থেকে এই ফোরামের খিচুরির ফ্লেভারটা অন্যরকম স্বাদ হয় কেনো আমি বুঝিনা। প্লেটের খাবার শেষ হতে না হতে আরো কিছু খাবার নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। প্রয়োজনে অনেকে আবার নিলো এবং মনের মধ্যে স্বাদটা অটুট রাখার জন্য আমিও কিছুটা নিলাম।
এরপর শুরু হলো সিডিউল মোতাবেক ‘কুরআনের গল্প শুনি’। ক্রিয়েটিভ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতির উদ্বোধনী ঘোষণার পর শুরু হলো ‘কুরআনের গল্প শুনি’ গল্পের আয়োজন। ক্লাবের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান গল্প শুরু করলেন। প্রথমেই সূরা মুমিনুন-এর ১-১১নং আয়াত তেলাওয়াত করলেন। মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে এ কয়েকটি আয়াত। উক্ত আয়াতের অর্থ উল্লেখ করা হলো : ১. নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মু’মিনরা ২) যারাঃ নিজেদের নামাযে বিনয়াবনত হয়, ৩) বাজে কাজ থেকে দূরে থাকে, ৪) যাকাতের পথে সক্রিয় থাকে, ৫) নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, ৬) নিজেদের স্ত্রীদের ও অধিকারভুক্ত বাঁদীদের ছাড়া, এদের কাছে (হেফাজত না করলে) তারা তিরষ্কৃত হবে না, ৭) তবে যারা এর বাইরে আরো কিছু চাইবে তারাই হবে সীমালংঘনকারী, ৮) নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে ৯) এবং নিজেদের নামাযগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে, ১০) তারাই এমন ধরনের উত্তরাধিকারী যারা নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে ফিরদাউস, লাভ করবে ১১) এবং সেখানে তারা থাকবে চিরকাল।
তিনি সূরাটির নামকরণ ও নাযিলের সময়কাল সম্পর্কে বললেন। নবী সা. ও কাফেরদের মধ্যে ভীষণ সংঘাত সম্পর্কে আমাদের মাঝে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করলেন। নাজিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও খুব সুন্দর আলোচনা করলেন তিনি। মনোযোগ সহকারে তার আলোচনা আমরা সবাই শুনলাম। কিছু সময় আলোচনার পর শেষ হলো ‘কুরআনের গল্প শুনি’ পর্ব।
এরপর শুরু হলো প্রতিযোগিতা ‘হাড়ি ভাঙ্গা’র অনুষ্ঠান। আমি বাসের মধ্যেই সিডিউল হাতে নেয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম ৪টি হাড়ির অর্থ কি? প্রতিযোগিতায় আমিও অংশগ্রহণ করলাম। কিন্তু চোখ খোলার পর দেখতে পেলাম মাত্র দু’টি ধাপের জন্য হাড়ির কাছে যেতে পারলাম না। আফসোস থেকে গেলো। মু. আতাউর রহমান সরকার ভাই আমাকে বললেন, আর একটু সামনে গেলেই ভাঙতে পারতে। ইতোমধ্যে দু’টি হাড়ি ভাঙা হলো এবং খেলার বিরতি দেয়া হলো। এরপর ছিলো ‘ঘুরে ফিরে দেখা’র পালা। আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হলাম এবং পুরো বন সফর করতে লাগলাম। আমাদের দলে ছিল মাত্র তিনজন। আমি, ফরিদ ভাই ও হানিফ ভাই। কিছুতেই ঘুরে ফিরে দেখা পবর্তটি জমাতে পারছিলাম না। একটু পরেই একটি ৮ জনের একটি দল এলো। সে দলের সঙ্গে আমরা যুক্ত হলাম। 
গাছগাছালিতে ঢাকা এ উদ্যানের প্রতিটি জায়গাই নজরকাড়া। সারি সারি বৃক্ষের মাঝে পায়ে চলা পথ। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের জন্য ছিল বেঞ্চ কিংবা ছাউনি। আমরা ছাউনিগুলোতে কিছু ছবি ক্যামেরা বন্দি করলাম। বনের মাঝে কোথাও কোথাও চোখে পরলো ধানক্ষেত। আবার কিছু চতুষ্পদ গৃহপালিত জন্তুও চোখে পড়লো। কোথাও আবার পুকুর কিংবা ছোট আকারের লেক। অনেক লাল শাপলা ফুল দেখলাম। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মূল উদ্ভিদ ছিলো শাল। প্রায় ২২০ প্রজাতির গাছপালা আছে এ বনে। এর মধ্যে ৪৩ প্রজাতির বিভিন্ন রকম গাছ, ১৯ প্রজাতির গুল্ম, ৩ প্রজাতির পাম, ২৭ প্রজাতির ঘাস, ২৪ প্রজাতির লতা, ১০৪ প্রজাতির ঔষধি গাছ। জীব বৈচিত্র্যের কমতি ছিল না এ বনে। প্রায় ১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫ প্রজাতির পাখি ও ৫ প্রজাতির উভচর প্রাণীও রয়েছে এ বনে। বনের মধ্যে দিয়ে রাস্তার মতো অনেক গাড়িও চলাচল করছে। কিছু দেখলাম ঘোড়ার গাড়ি, টমটম, অটো রিকশা, ভ্যানও ইত্যাদি। সাধারণত ট্যুরিস্টরাই এসব যানবাহন চালান এবং পার্ক স্পটে পৌঁছে দেন।
এছাড়া ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে আছে বেশ কয়েকটি বনভোজন কেন্দ্র। এগুলোর নাম ছিল বেশ মজার। যেমন : আনন্দ, কাঞ্চন, সোনালু, অবকাশ, অবসর, বিনোদন আরো কত বাহারি নামের বনভোজন কেন্দ্র। শুনলাম কিছু কিছু স্পটে ২২টিরও বেশি বনভোজনের আয়োজন করা হয়েছিল। স্পটগুলোতে  রান্নার আয়োজন চলছে। আবার কেউ কেউ ক্রিকেট ছাড়াও অন্যান্য খেলাধুলার আয়োজন করছে। এদিকে পার্কের মধ্যেই ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিকও দেখাচ্ছেন। এখানকার কটেজগুলোও বাহারি নামের। যেমন : বকুল, মারঞ্চ, মাধবি, চামেলী, বেলী, জুঁই ইত্যাদি। নামের মতো এগুলোর পরিবেশও ভিন্ন আমেজের ছিল। 
আমরা আরেকটি স্পটে গেলাম। শুনেছি নাকি এখানে ওয়াচ টাওয়ার আছে। সেখানেই আমাদের দলটি পৌঁছামাত্র আমরা প্রথম দলের তিনজন দৌঁড় দিলাম। বড় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। ওয়াচ টাওয়ারে উঠলাম এবং টাওয়াটি উচ্চতা হবে প্রায় ৭ তলা । ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দেখলাম পুরো বাগান, বিশাল বাগান। আমরা সেখানে পরস্পরের ছবি তুললাম। এই ওয়াচ টাওয়ারে আবার আমাদের এবং বাইরের কিছু দল অন্তর্ভুক্ত হলো। ওয়াচ টাওয়ার থেকে ফিরে এসে আমরা পার্কের মধ্যেই চা খেলাম এবং  আমরা সবাই মজা করলাম।
ঘুরা ফিরে দেখার পর্ব শেষ করে আমরা আবার এলাম আমাদের চামেলি স্পটে। সেখানে ‘সিঙ্গারা’ নাস্তার পরিবেশন করা হলো। এরপর আমরা সালাতুল জুম্মার নামাযের জন্য রওয়ানা হলাম। নামায পড়ে আমরা আবার নিজ স্পটে আসলাম। এদিকে আমাদের রান্নারও আয়োজন চলছে।
শুরু হলো প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় পর্ব (বল নিক্ষেপ) খেলা। বাছাই পর্বের মাধ্যমে খেলার সমাপ্তি ঘটলো। কিছুক্ষণ খেলাধুলার পর দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হলো। এরকম আয়োজন ইতোপূর্বেই আমরা দেখেছি। কোনো কোলাহল নেই, হৈ-হুল্লোরও নেই। নীরবতার মাধ্যমে খাবারের আয়োজন করা হলো। কেউ কিছু না পেলেও ধৈর্য্য ধরে থাকলেই সব কাছে হাজির হয়ে যায়। খাবার প্লেট সামনে এলো। সাথে সালাদও। কাউকে আবার লবনও দেয়া হচ্ছে। একে একে সবাইকে খাবার দেয়া হলো। আবার খাবার আয়োজন করছেন আমাদের সিনিয়র ভাইয়েরা। প্রথমেই মুরগির গোশত। পরে গরুর গোশত। প্রয়োজনবোধে আবারও দেয়া হচ্ছে ভাত, গোশত ও তরকারি।
খাবার শেষে আমরা আইসক্রিমও খেলাম। আইসক্রিম বিক্রেতাকেও এক প্লেট খাবার খেতে দেয়া হলো। সেও খেলো। তার দাঁড়িয়ে খাওয়া দেখে আমি তাকে একটি চেয়ার এগিয়ে দিলাম।
খাবার শেষে আবার শুরু হলো প্রধান অতিথির প্রোগ্রাম। প্রোগামে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি খুব সুন্দর বক্তৃতা দিলেন। তিনি একটি গল্প বললেন। গল্পটি হলো- একটি লোক ও তার সন্তান ট্রেন ভ্রমণ করছেন। তার সন্তানটি খুব দুষ্টমি করছে কিন্তু তার বাবা তার দুষ্টমি দেখে হাসছে। ট্রেনের অন্য যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে লোকটিক বলল, আপনার বাচ্চা দুষ্টমি করছে আর আপনি হাসছেন কেনো? বাচ্চাটির বাবা বললেন, গতকাল তার মা অর্থাৎ আমার স্ত্রী মারা গেছে। কিন্তু এ ব্যাপারটাতো বাচ্চা বুঝতে পারছে না। আবার আমার মনও ভালো নেই। বাচ্চা খেলছে আমি কেন মন খারাপ করে থাকতে পারি। তাই হাসছি। ঘটনাটি শুনে ট্রেনের যাত্রীরা নিরব হয়ে গেলেন।
এই গল্পটির বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে অনেক নেতা যেমন- শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা, শহীদ মুজাহিদ, গণমানুষের নেতা শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শহীদ মীর কাসেম আলী তারা সবাই চলে গেছেন। এসব শহীদদের কথা মনে পড়লে আমাদের মন কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা এই জমিনে (বাংলাদেশে) এক সময় ইসলামী আন্দোলনের জন্য কাজ করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা আজ আমাদের মাঝে নেই। যারা মৃত্যুকে ভয় না করে ‘প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আমাদের নিকট পবিত্র আমানত’ মনে করে ইসলামী আন্দোলনের কাজ করেছেন। দুনিয়ার মুক্তি ও আখেরাতের শান্তির জন্য তাদের রেখে যাওয়া কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য আমাদেরই আজ লড়তে হবে। বুকের মাঝে দুঃখ-কষ্ট অতিক্রম করে হাসিমুখে কাজ করতে হবে। আজ আমরা গাজীপুর এসেছি মনের মধ্যে শোক নিয়ে আমাদের হাসতে হচ্ছে। তার বক্তব্য শুনার সময় অনেকের মাঝে লক্ষ্য করলাম অনেকের চোখে পানি এসেছে। আমি তাদের বাহিরে নয়। আমার চোখও ভিজে আসছে। প্রধান অতিথি আরো বললেন, ঢাকার বাড়িওয়ালা বা ধনী ব্যক্তিরা কেনো ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত নয়। আবার তারা আসে সবার শেষে। যখন ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। ইসলামী দল প্রতিষ্ঠার সময় যারা জীবন কুরবানি করে তারা বেশি লাভবান। না, পরে এসে দলে যোগদান করে তারা লাভবান? এখান থেকে আমরা অনেক শিক্ষা অর্জন করতে পারি। 
প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হলো। প্রতিযোগিদের পুরস্কার দেয়া হয়েছে কিনা সে সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করলেন। পুরস্কার প্রাপ্তিদের জন্য তিনি খুব খুশি হলেন এবং বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে প্রস্থান করলেন।
প্রোগ্রামের শেষ পর্যায়ে এরপর শুরু হলো জরুরি ওয়াদা। জরুরি ওয়াদার মধ্যে সবার নাম এন্ট্রি করা হলো। আমারটাও বাদ পড়লো না। আমি খুশি মনে ওয়াদা করলাম এবং ওয়াদা করার পর নিজেকে খুব গর্বিত মনে করলাম। 
প্রধান অতিথি বক্তব্যে বলেছিলেন, ফোরামটিকে টিকে রাখার জন্য আমাদের সবারই সার্বিক সাহায্যে প্রয়োজন। জান ও মালের সাহায্য ছাড়া কখনোই ইসলামী খেলাফত কায়েম হয় না। ইসলামী খেলাফতের জন্য আমাদেরকে জান ও মাল দিয়ে সাহায্য করতে হবে। জরুরি ওয়াদা সম্পর্কে আমাদের অবগত করলেন। দাওয়াতি কাজের সময় সেসব কয়েকটি হাদিস ও কুরআনের আয়াতের কথা আমার মনে পড়ে গেল। সেগুলো হলো-
“তোমাদের ঐসব জিনিস, যা তোমরা ভালোবাস তা (আল্লাহর পথে) খরচ না করা পর্যন্ত তোমরা নেকি হাসিল করতে পার না। আর তোমরা যা কিছু খরচ করবে তা আল্লাহর অজানা থাকবে না।” (সূরা আল ইমরান-০৩:৯২)
“যারা তাদের মাল আল্লাহর পথে খরচ করে এবং এরপর তা বলে বেড়ায় না ও কষ্ট দেয় না, তাদের পুরস্কার তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোন চিন্তা ও ভয়ের কারণ নেই।” (সূরা বাকারা-০২:২৬২)
“যারা সব অবস্থায়ই নিজেদের মাল খরচ করে-খারাপ অবস্থাই থাকুক আর ভালো অবস্থায়ই থাকুক; যারা রাগকে দমন করে এবং অপরের দোষ মাফ করে দেয়; এমন নেক লোক আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। (সূরা আল-ইমরান- ০৩:১৩৪)
“হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি দান করতে থাক, আমিও তোমাকে দান করব। (বুখারী : বাবু ফাদলিন নাফাকাতি আলাল আহলি ৪৯৩৩)
জরুরি ওয়াদার পর্ব শেষ করে আসরের নামাযের আয়োজন করা হলো। এরপর শুরু হলো পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনি অধিবেশন। এখানে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনেকেই বক্তব্য রাখলেন। এই অনুষ্ঠানের চামেলী স্পটের সার্বিক সহায়তা যে করেছিলেন সেও আমাদের সামনে বক্তব্য রাখলেন। কিন্তু তার কথার মধ্যে মুদ্রা দোষ বা জড়তার ভাব প্রকাশ হলো। আমি মনে মনে দোয়া করলাম আল্লাহ আমাদের সবার মুখের ও সকল প্রকার জড়তা দূর করে দিন। আমিন।
সবশেষে বক্তব্য রাখলেন ক্রিয়েটিভ ট্যুরিস্ট ক্লাব, রমনার সভাপতি আতোয়ার রহমান সরকার। তিনি প্রধান অতিথির বক্তৃতার কিছু অংশ আমাদের মাঝে তুলে ধরলেন। যারা সংগঠন থেকে ইতোমধ্যে শহীদ হয়ে চলে গেছেন তারা তো আমাদের আত্মীয় নয় কিন্তু আমাদের চোখে পানি আসে কেনো। কারণ তারা আমাদের ইসলামী আন্দোলনের ভাই, আত্মার আত্মীয়। তখন আমার মনে পড়ে গেল আমাদের প্রিয় হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও সাহাবিগণদের কথা। তারা শুধুমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের জন্য ইসলামী বিরোধীদের সাথে লড়াই করেছে। অনেকে সাহাবী হারিয়েছেন হাত, অনেকেই পা হারিয়েছে, হযরত বেলাল (রা.) কে বালুর মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। তারা তো আমাদের আত্মীয় নয়। তখন কেনো আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে। চোখে পানি আসে। নবী-সাহাবীদের ধারাবাহিকতায় তাদের দায়িত্ব এখন আমাদের দায়িত্ব। কারণ পৃথিবীতে ইসলাম টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেকে শহীদ হয়েছেন। আজ তাদের কর্তব্য আমাদের কাঁধে এসেছে। এটিই এখন আমাদেরই কাজ, আমাদেরই দায়িত্ব এবং দ্বীনি দায়িত্ব।
ক্রিয়েটিভ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কাক্সিক্ষত আয়োজন শিক্ষাসফর ও মিলন মেলার ‘প্রাণের উল্লাসে, চলো মিলি এক স্রোতে’ অনুষ্ঠান শেষ হলো। এর পর শুরু সিডিউল মোতাবেক ‘ফটোসেশন’। আমরা সবাই পেছনে ব্যানার দিয়ে গ্রুপ ছবি তুললাম। আবার ভিন্ন ভিন্ন ইউনিট নিয়ে ছবি তোলা হলো। এরপর সালাতুল মাগরিব নামাজের আযানের অপেক্ষায় সবাই বসে পড়লাম এবং চামেলি স্পটেই নামায আদায় করলাম। নামায শেষে যে যার মতো নিজ গৃহে ফেরার জন্য গাড়িতে উঠে আসন গ্রহণ করলাম। মহান আল্লাহর নামে আমরা সবাই ঘরে ফিরলাম।

লেখক : ইউনিট সভাপতি, ৩৫ পূর্ব-১, রমনা পশ্চিম। যোগাযোগ : ০১৮৫০০৬৯৭৯২

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২০১৮ইং সালে অনুষ্ঠিতব্য ভ্রমণের পর লেখা হয়েছে। প্রতি বছরই উপরোক্ত লেখাটির আলোকেই আমাদের সকল প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়।

এ বিভাগের সর্বশেষ